Ifter History of Bangladesh
বাংলাদেশে রমজানের ইফতার ইতিহাস
বাংলাদেশের কিছু জনপ্রিয় ইফতার আইটেমের মধ্যে রয়েছে: খেজুর, ছোলা, পিয়াজু, মুড়ি, আলুর চপ, বেগুনী, হালিম, বিভিন্ন রকমের কাবাব, জিলাপি, দই, শরবত ইত্যাদি।
এগুলি রমজান মাসে বাংলাদেশে জনপ্রিয় ইফতার আইটেমের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।
বাংলাদেশে ইফতারের ইতিহাস বহু শতাব্দী আগের। এই অঞ্চলের লোকেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উপভোগ করে আসছে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী ইফতার আইটেম। বাংলাদেশের কিছু প্রাচীন ইফতার সামগ্রীর মধ্যে রয়েছেঃ ছোলা বুট, বোরহানি, জর্দা, জিলাপি, পিঠা, লাস্সি, খেজুর, ডিমের চপ, শরবত।
এগুলি কয়েক শতাব্দী ধরে বাংলাদেশে উপভোগ করা বহু প্রাচীন ইফতার আইটেমের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। সময় অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও, এই খাবারগুলি দেশের রন্ধনসম্পর্কীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে রয়ে গেছে এবং সব বয়সের মানুষের দ্বারা উপভোগ করা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলার মানুষ যেভাবে পবিত্র রমজান মাস উদযাপন করে তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়েছে।
Photo: Wikimedia Commons
মুঘল আমলে ইফতার একটি জমকালো অনুষ্ঠান ছিল যা সম্রাট নিজেই আয়োজন করতেন। রাজকীয় শেফরা কাবাব, বিরিয়ানি এবং সমৃদ্ধ তরকারির অন্তর্ভুক্ত খাবারের একটি জমকালো স্প্রেড প্রস্তুত করবে। এই খাবারগুলি বিভিন্ন ধরণের রুটির সাথে পরিবেশন করা হয়েছিল, যেমন নান, রোটি এবং পরাঠা। ফল ও মিষ্টি জাতীয় খাবারও ছিল ইফতারের মেনুর অপরিহার্য অংশ।
সময়ের সাথে সাথে, ইফতারের ঐতিহ্য ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় স্বাদ এবং শৈলী গ্রহণ করে। বাংলাদেশে, ইফতার দেশের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, ঐতিহ্যের সাথে সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে।
ঢাকার মুঘল ইফতারি ছিলঃ নান-তাফতান (বাদাম দিয়ে রুটি), শিরমল (সুজি দিয়ে তৈরি রুটি), সিখ কাবাব, সুতলি কাবাব, মোসাল্লাম কাবাব, শামি কাবাব, হান্ডি কাবাবের। এগুলোর সুগন্ধ ছাড়া মুঘল ইফতার কল্পনা করা যেত না। তাছাড়া ইফতারের জন্য মাছের কাবাব, বিরিয়ানি, কিমা, পোলাও, বাকরখানিরও ছিল প্রচুর কদর।
১৬৩৯ সালের দিকে বাংলার সুবেদার শাহ সুজা ইফতারে পারিবারিক সুবাদে খোরাসানি পোলাও প্রবর্তন হয়।
তবে এ অঞ্চলের আবহাওয়া গরম থাকায় বাংলায় সব সময় শরবত দিয়ে ইফতার শুরু হত। ইফতারের আগে সিল করে শরবত কুয়ায় রাখা হত ঠান্ডা করার জন্য। শরবতের প্রধান উপাদান ছিল দুধের সঙ্গে বাদাম, কিশমিশ, পেস্তা, জাফরান ইত্যাদি মেশানো।
কিন্তু এ সবই ছিল পরিবারের ইফতার।
ইফতারের সময় বাংলাদেশের সাধারন মানুষ সাধারনত চালের তৈরি চ্যাপ্টা রুটি বা রুটি এবং দুই-তিন ধরনের মাছ দিয়ে পান্তা খেতেন। মুড়ি ভর্তা, শরবত ও ফলমূল দিয়ে ইফতারও হত। তখন বাজারে শিঙ্গাড়া বা বেগুনি তেমন কিছু ছিল না। বয়স্ক মানুষ ইফতারের পর তামাক খেতেন।
অভিজাত ঢাকাবাসী বাজার থেকে ইফতার কেনেননি। এটা ছিল তাদের আভিজাত্যের অংশ। তারা বাড়িতে খাবার তৈরি করতে পছন্দ করতেন। এগুলো যদি বাজারে পাওয়া যেত, তাহলে আভিজাত্য কীভাবে থাকত?
মুঘল আমল থেকেই চকবাজার শামি ও শুতি কাবাবের জন্য বিখ্যাত ছিল। হালুয়া ও শরবতও পাওয়া যেত।
সময়টা উনিশ শতকের ও বিশ শতকের শুরুর ঢাকার প্রতিচ্ছবি। শবে-বরাতের পরেই রমজানের আগমন বার্তা ঢাকার ঘরে ঘরে ও মহল্লায় ব্যস্ততা ও সব ধরনের প্রস্তুতির আবহাওয়া পরিলক্ষিত হতো। মসজিদের শহর ঢাকার মসজিদের চুনকাম ও পরিচ্ছন্নতা রমজানের পূর্বাভাস। দরিদ্র লোকেরাও নিজেদের ঘর মাটি দিয়ে মুছে ঝকঝকে বানিয়ে ফেলতো। তোকমা, ইসবগুল, গোলাপ কেওড়া সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব এনে রাখা হতো। ২৭ সাবান নতুন হাঁড়িতে মুগ ডাল ভিজিয়ে রাখা হতো যাতে পহেলা রোজায় তা অঙ্কুরিত হয়ে বের হয়ে যায় এবং ইফতারে তার ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া ছোলা ও অন্যান্য উপকরণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হতো। চাঁদ রাতে বাজারগুলোতে মানুষের ভিড় লেগে যেত।
অতঃপর রমজানের চাঁদ দেখার প্রস্তুতিঃ ঢাকার উঁচু ইমারতের ছাদের উপর লোকজন সময়ের আগে পৌঁছে যেত, উৎসাহীরা নৌকায় নদীর মাঝখানে গিয়ে চাঁদ দেখতো। প্রথম দেখার প্রতিযোগিতায় হইহুল্লোড়, খুশী বালক যুব্ ক্ষেত্রবিশেষে বৃদ্ধরা তাদের দৃষ্টি শক্তি পরীক্ষার জন্য অবশ্যই পৌঁছাত। চাঁদ দেখার পর হৈচৈ এবং একে অপরকে মোবারকবাদ দেওয়া, ছোটরা বড়দের কাছে সালাম করে দোয়া নিয়ে ফিরে যেত মসজিদগুলোতে। সেহরির ঘুম থেকে জাগাবার জন্য কিছু লোকের উপর দায়িত্ব বন্টন করা থাকতো যারা লন্ঠন ও লাঠি নিয়ে দরজায় দরজায় চিৎকার দিত “রোজাদারেরা ওঠো সেহেরী খাবার সময় হয়েছে”।
সেহেরীতে ঢাকাবাসীরা সব সময় গরম খাবার খেতে অভ্যস্ত ছিল এবং এখনো এই অভ্যাস হয়েছে। সেহরিতে শুধু নতুন ভাত রান্না হতো অন্যথায় তরকারি দিনের বেলায় রান্না করা, যা গরম করে পরিবেশন করা হত। পুরুষেরা অধিকাংশ রুটি খেতো কিন্তু মহিলারা ভাতই পছন্দ করত ফিরনি বা ক্ষীর রান্না হতো। কোথাও বা দুধ ফালুদা। কম অবস্থা পূর্ণ লোকেরা শিন্নির জন্য বাজার থেকে দুধের সর ও খিরসা আনতো, যা চিনি দিয়ে খাওয়া হত। ঢাকায় মোগল ও কাশ্মীরিদের বাড়িতে সেহরির পর চা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল তারা বলতেন এর দ্বারা দিনের বেলায় পিপাসা কম হয়। হুক্কা পান গ্রহনকারী ব্যক্তিরা ওই সময় কড়া ধরনের তামাক সহযোগে একবার অবশ্যই পান করত। অতঃপর পরহেজগার লোকেরা ফজরের আযানের অপেক্ষায় কোরআন তেলাওয়াত করত অন্যান্য লোকেরা ঘুমিয়ে যেত। ফজরের নামাজের মসজিদ গুলো প্রায় খালি থাকতো। ব্যবসায়ীরা সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠে কাজে লেগে যেতে কিন্তু বিত্তশালীদের জোহর পর্যন্ত ঘুমাতে দেখা যেত। যোহরের পরে মহিলারা রান্নার ভার গ্রহন করত। উৎসাহী পুরুষ লোকেরা রান্নার কাজে কিছু না কিছু সময় ব্যস্ত থাকতো। বাজার থেকে আসতো শিক কাবাব। মুরগির শিক কাবাব অথবা মুরগির হাডি কাবাব অধিকাংশ বাড়িতে বানানো হতো। কাবাবের জন্য রুটি ও পরোটা তৈরি হতো। বাকরখানি প্রায়ই মজুদ থাকতো। নিম্নবিত্তের মধ্যে চালের ও আটার রুটির প্রচলন ছিল। রমজানের চকবাজারে ইফতারের দোকান বসত। ইফতার সামগ্রিক ঢাকার লোকেরা “রোজা খোলাই” বলত।
ফলমূলের মধ্যে পানি ফল, চিনা আলু, আর যে কোন মৌসুমী হোক না কেন রমজান মাসের ইফতারে অবশ্যই যুক্ত থাকত আখের ছোট ছোট খণ্ড গোলাপ ও কেওড়া দ্বারা সুবাসিত করে রাখা হতো।
খেজুর একটি প্রধান ইফতারি অনুষঙ্গ এবং মিষ্টান্ন এর মধ্যে জিলাপি ও দই বড়া বাজারে এবং বাসায় তৈরি হতো । ঢাকাবাসীর ইফতারের নতুন নতুন খাবার যোগ হয়েছে কিন্তু স্বাদ বিচারে অনেক খাবারই তাদের নিজস্বতা পায়নি । এ বিষয়ে একটি চকবাজারের ইফতার নাম করা যায়। যা “শেখ চূড়া” নামে এক সময় পরিচিত থাকলেও বর্তমান সময়ে “বড় বাপের পোলায় খায়” নামে পরিচিত।
প্রতিটি জেলায় ডিসির তত্ত্বাবধানে ইফতার ও সেহরির জন্য সাইরেন বাজানোর রীতি চালু ছিল। ঢাকায় ১৯ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত কামান ও বন্দুক দিয়ে রমজান শুরুর ঘোষণা দেওয়া অব্যাহত ছিল।
সেহরি
দুধ ও ভাত সেহরির জনপ্রিয় খাবার ছিল।
বাংলাদেশে মোটামুটি সব ধর্মের মানুষই মুসলমানদের সাথে ইফতারে অংশগ্রহণ করেন। আমরা নিজেরাই দেখি অফিসে, মার্কেটে, বন্ধু মহলে আরও অনেক পরিস্থিতিতে রোজাদারদের সাথে সকল ধর্মের মানুষই অংশগ্রহণ করেন। এটা একটা অপূর্ব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।
—–Reference book : উনিশ শতকের অংশটি সাদ উর রহমান এর “ঢাকাই খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতি” বই থেকে