আমি মাহজাবীনের গল্প বলছি
আমার নাম মোসাম্মৎ মাহ্জাবীন।
আমার জন্ম ঢাকাতেই । ঢাকা তেই বড়ো হয়েছি পড়াশোনা করেছি।
আমি কম্পিউটার সায়েন্স এ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করি এবং টিচিং প্রফেশনে ঢুকি। পড়াতে আমার খুবই ভালো লাগে।
কিন্তু যখন আমার রাজকন্যা এই পৃথিবীতে আসে তখন কিছু শারীরিক প্রবলেমের কারণে আমি চাকরি ছেড়ে দেই।। তারপর আমি আর চাকরি করিনি। তবে এখনো কলেজের স্টুডেন্টদের ICT পড়াই।
মেয়ে যখন ছোট ছিল তখন বাসায় খুব বোরিং ফিল করতাম একটা কিছু করতে ইচ্ছে করতো। রান্না আমার খুব ভালো লাগতো। তবে প্রতিদিনের নরমাল রান্নাবান্না না, স্পেশাল রান্না। তাই আমি কিছু কোর্স করি এবং বাসায় যখন এগুলো রান্না করতাম তখন সবাই খুব প্রশংসা করত। বিশেষ করে বাসায় যখন কোন গেস্ট আসতো এবং আমার রান্না করা খাবার খেতো তখন সবাই বলতো এত মজার খাবার রেস্টুরেন্ট ও ফেল। বলতো তুমি একটা রেস্টুরেন্ট খুলে ফেলো। তখন খুব ইন্সপায়ারড হতাম, ভালো লাগতো। তখন ভাবতাম, যদি আসলেই একটা রেস্টুরেন্টে খুলতে পারতাম! ভালো হত।
বিশেষ করে আমার কুকিজটা সবাই খুবই পছন্দ করতো। আমার মেয়েকে সব বাইরের দেশের কুকিজ চকলেট বিভিন্ন খাবার কিনে খাওয়াতাম। তারপর যখন নিজে কুকিজ বানানো শুরু করলাম আমার মেয়ে আমার কুকিজই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করত আর বাইরের কেউ আসলে তো কথাই নেই। তারপর আস্তে আস্তে মেয়েকে বাইরের খাবার বন্ধ করে আমার তৈরি বিভিন্ন স্পেশাল খাবার দিতাম। কারণ সে বাইরের খাবারের থেকে আমার হাতের বানানো খাবার পছন্দ করত আর ছিল পুষ্টিকরও?।
Corona শুরু হল, তখন অনলাইন ভিত্তিক কেনাকাটার বেড়ে গেল, আগেও করতাম কিন্তু তখন বেশি এবং তখনই উদ্যোক্তাদের গল্প, সফলতার গল্প পড়তাম তখন ভাবতাম, “আমিও তো তাদের মত একজন সফল উদ্যোক্তা হতে পারি”। স্বপ্ন পূরণের সাহস যোগাই।
আমার উদ্যোক্তা জীবনের শুরু ২০২০ সালের আগস্ট মাসে। আমি কিছু কুকিজ বানাই, সেগুলোর কতগুলো ছবি তুলি। রাতে একটা ফেসবুক পেজ খুলি এবং ছবিগুলো পোস্ট করি।
সেই দিনই দুইটা অর্ডার আসে আলহামদুলিল্লাহ। যদিও দুইটাই আমার আত্মীয় করেছিল। তারপরও ভিষন খুশি লেগেছিল। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে যা যা কিনা লাগবে (বাটার, ময়দা, চিনি ইত্যাদি ) তা কিনা, প্যাকেট, বক্স। কুকিজ বানানো শুরু করলাম। ডেলিভারি দিলাম রিভিউ এর অপেক্ষায় রইলাম। আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ তারা খেয়ে খুবই প্রশংসা করলো। এরপর আরো কিছু আমার আত্মীয় স্বজন, কিছু বন্ধু বান্ধব কিছু কলেজের স্যার অর্ডার করলো। তাদের রিভিউ থেকে আরো অনেকে। ঢাকা থেকে ঢাকার বাইরে….. এভাবে দিন দিন অর্ডার বাড়তে থাকল আর রিভিউ পরিমাণ বাড়তে থাকে আর আমার স্বপ্ন যেন পাখা মেলা শুরু করলো।
সারা দিন-রাত পরিশ্রম করতে পারতাম। এতটুকু ক্লান্তি লাগতো না খুবই ভালো লাগতো। এমনও দিন গেছে যে ভোরে নামাজ পড়ে কাজ শুরু করেছি মাঝখানে শুধু খাবার খেয়েছি আর নামায পড়েছি। কাজ করতে করতে রাত বারোটা একটা দুইটা বেজে গেছে তারপরও কোনো ক্লান্তি নেই। অদ্ভুত এক আনন্দ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন। প্রথম প্রথম আমার কোন হেল্পিং হ্যান্ড ছিল না আমি একাই সবকিছু করতাম আর আমার হাজব্যান্ড প্যাকিং, হোম ডেলিভারিতে সাহায্য করেছে। তারপর আস্তে আস্তে ডেলিভারি ম্যান এর খোঁজ নিলাম একটু সুবিধাহল। তারপর হেল্পিং হ্যান্ড রাখলাম আস্তে আস্তে পরিসর বাড়ল। তারপর একসময় চিন্তা করলাম যে আমার আরও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
তাই আমি Bangladesh Parjatan Corporation এর National Hotel & Tourism Training Institute (NHTTI) থেকে এক বছরে ডিপ্লোমা-ইন কালিনারি আর্টস এন্ড ক্যাটারিং ম্যানেজমেন্ট শেষ করি, পাশাপাশি হাইজিন কোর্স, নন-অ্যালকোহলিক এন্ড বেভারেজ কোর্স করলাম। নিজেকে আরও দক্ষ করে গড়ে তুললাম।
আলহামদুলিল্লাহ ১ বছর ৬ মাসে আমার অর্ডার সংখ্যা ১০৩৮ হল। আমি মনে করি এটা আমার জন্য এক বিশাল ব্যাপার। আর মনে করি এটা সম্ভব হয়েছে
আল্লাহর অশেষ রহমতে,
পরিবারের সহযোগিতা,
আমার দক্ষতা,
হাইজিন মেইনটেইন করা পুষ্টিকর, স্বাস্থ্যকর, মজাদার খাবার তৈরি করার জন্য।
আগে মাত্র তিন রকমের কুকিজ তৈরি করতাম। আর এখন প্রায় ষোল রকমের কুকিজ এবং ১৫ রকমের ফ্রোজেন ফুড এবং বিভিন্ন ধরনের ডেজার্ট আইটেম, পিঠা, পাউন্ড কেক, কাপকেক আরো অনেক ধরনের খাবার তৈরি করি। আমার এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচশোর মত কাস্টমার। তারমধ্যে একশোর বেশী রিপিট কাস্টমার। কিছু কিছু কাস্টমার আছে যারা এই দেড় বছর ধরে আমার থেকে খাবার নিচ্ছে এবং তারা খুবই সন্তুষ্ট। শুধু তাই নয় প্রথমে আমি শুধু ঢাকায় ডেলিভারি দিতাম। তারপর ঢাকার গন্ডি পেরিয়ে ঢাকা ছাড়াও এই পর্যন্ত সারা বাংলাদেশের আমি প্রায় ১৫ টি জেলায় ডেলিভারি দিয়েছি। সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, যশোর, খুলনা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, পিরোজপুর, বরিশাল, নোয়াখালী, রংপুর, শেরপুর আরও কত জাইগাতে। এছাড়া দেশের বাইরে গিয়েছে এই পর্যন্ত ৫ বার। আমি মনে করি এটা আমার জন্য বড় পাওয়া।
এখন আমি আরো দূরে যেতে চাই। অনেক বড় বড় কাজ করতে চাই। কর্পোরেট কাজ করতে চাই। আগে হয়তো ১০ জন ২০ জনের খাবার পাঠাতাম। শেষ আমি ৮০০ জনের খাবার তৈরি করি। এখন আমি চাই ১০০০ ২০০০ ৩০০০ লোকের খাবারও একবারে তৈরি করতে এবং সেই ভাবে নিজেকে গড়ে তুলছি। ইনশাল্লাহ সততার সাথে এভাবেই আমি এগিয়ে যেতে চাই।
৫ বছর পরে আমি চাই, আমাকে শুধু এই দেশে না দেশের বাইরেও সবাই আমার Mahjabeen’s kitchen কে চিনবে। একনামে চিনবে, জানবে এবং এই নামটাই ওদের মাথায় আসবে তখনই যখনই চিন্তা করবে যে স্বাস্থ্যকর পুষ্টিকর মজাদার খাবার। অন লাইন এর পাশাপাশি অফলাইনেও সবাই যেনো এই Mahjabeen’s kitchen কে ভালো মতো চিনে। পাশাপাশি আমি কিছু অসহায় মানুষের ও কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।